সুনামগঞ্জবাসীর প্রতি আহবান

- আপডেট সময় : ০৬:২১:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জানুয়ারী ২০২৫ ২০৪ বার পড়া হয়েছে
প্রিয় শহরবাসী,
আমরা সমবেত হতে চাই অধিকারহারার কষ্ট নিয়ে। বৈষম্যে ভুলুণ্ঠিত হয়েছে আমাদের অধিকার। আমাদের কিছু কর্মতৎপরতায় ইতিমধ্যে আপনারা অবহিত হয়েছেন, কেন আমরা বৈষম্যের শিকার, কেন আমরা আমাদের জেলা শহরকে উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার বলছি। জেলা শহর কাঠামোকে পরিকল্পিতভাবে পেছনে ফেলে রাখার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। অতীতের এমন কূটকৌশলের বিরুদ্ধে আজ নাগরিক সমাজ ঐক্যবদ্ধ। আমরা আমাদের অধিকার ফিরে পেতে চাই। জেলা শহর হোক এই সুনামগঞ্জের কেন্দ্রস্থল। এমন এক অভিপ্রায় নিয়ে আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনে এগোতে সমবেত হওয়ার আহবান জানাতে চাই ।
আমরা আঞ্চলিকতায় বিশ্বাসী নই, তবে উন্নয়নচিন্তায় সুষম উন্নয়ন ও একটি অঞ্চলকে নয়, পুরো অঞ্চল যাতে উপকৃত হয়, উন্নয়নের সুফল ভোগ করে, সেই চিন্তার প্রসার আমরা বরাবর চেয়েছি। অতীতে আমাদের পূর্বসূরীরা যে কোনো উন্নয়ন পদক্ষেপে সুনামগঞ্জ জেলা শহরকে প্রাধান্য দিয়ে, জেলা শহরকে বিস্তৃত করার চিন্তার প্রসার ঘটিয়েছেন। কিন্তু বিগত প্রায় দেড়দশক আমরা লক্ষ্য করেছি কেবল একটি গ্রাম ঘিরে সবকিছু হয়েছে। নিদেনপক্ষে সেই এলাকায়ও যদি ছড়িয়ে ছিটিয়ে উন্নয়ন হতো, তাহলেও বলার কিছু থাকতো না।
অত্যন্ত পরিতাপের সঙ্গে পরিলক্ষিত সেই সব উন্নয়নযজ্ঞ নিয়ে মুখ খুলে কিছু বলারও উপায় ছিল না। নিরূপায় অবস্থায় ছাত্র-জনতার আন্দোলন থেকে বৈষম্য চিরতরে দূর হওয়ার এই সময়ে আমরা সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ একটি প্রতিষ্ঠানকে সামনে রেখে এককাট্টা হয়েছি। এখানে স্বার্থ কেবল জেলাবাসীর। তাই আমাদের এই সমবেত হওয়া হয়তো কেবল একটি দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সোচ্চার হলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়ার ক্ষেত্রে জন-আকাঙ্খার বাস্তবায়ন অথবা জনগণের চাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট থেকে সুস্পষ্ট হবে।
আপনারা সবাই জানেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একটি সমাজ ও তার চারপাশকে কতটা আলোকিত করে। সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যদি হয় বিশ্ববিদ্যালয়, তাহলে গোটা বিশ্বকে আলোকিত করার প্রয়াস উপলব্ধির মধ্যে আসে। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়াস অবশ্যাই মাইলফলক একটি উদ্যোগ। জনগণের টাকায় সরকারের উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের কাছে কৃতজ্ঞ আমরা। তবে সবকিছু কুক্ষিগত করে একটি জায়গায় স্থাপন করার মানসিকতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।
আমরা চাই, বিশ্ববিদ্যালয়টির স্থান এমন একটি জায়গায় নির্ধারণ হোক, যেখান থেকে সুনামগঞ্জ জেলা শহরের সুযোগ সুবিধাজনকভাবে পর্যায়ে আসে। আমাদের এই চাওয়া জন-আকাঙ্খা। এ জন্য এ বিষয়ে আমরা সুনামগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অন্তবর্তী সরকারেরর মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা বরাবর একটি স্মারক লিপি দিয়ে আমাদের চাওয়ার বাস্তবায়ন চেয়েছি।
বাংলাদেশের উত্তরপূর্বের সীমান্ত জেলা সুনামগঞ্জ হাওরাঞ্চল হিসেবে সুপরিচিত। সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণ বৈষম্যমূলক। এ নিয়ে শুরু থেকে বিতর্ক দেখা দেয়। জেলা শহরকে পাশ কাটিয়ে একটি উপজেলায় এটির ক্যাম্পাস স্থাপনের তৎপরতায় জেলার মানুষ চরমভাবে ক্ষুব্দ। শুরু থেকেই জেলার মানুষের দাবি ছিল, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হবে জেলা শহরের কাছাকাছি কোনো সুবিধাজনক স্থানে। কিন্তু গণমানুষের দাবির প্রতি শুরু থেকেই তৎকালীন একজন মন্ত্রী তীব্র বিরোধিতা করছেন। শান্তিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা ওই সাবেক মন্ত্রী এখনো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জেলা সদরকে পাশ কাটিয়ে তার নিজ উপজেলায় করার চেষ্টায় রয়েছেন। এটি উন্নয়ন বৈষম্যমূলক ও দুঃখজনক বটে।
সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুমোদন হয়। জাতীয় সংসদে ‘সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ আইন পাস হয় ২০২০ সালের ১৮ নভেম্বর। এরপর জেলা শহর সুনামগঞ্জের প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে শান্তিগঞ্জ উপজেলার একটি ভাড়া করা ভবনে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম। প্রথম দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান ‘শান্তিগঞ্জ’ উল্লেখ করায় বিষয়টি নিয়ে সব মহলে ক্ষোভ দেখা দেয়। বিষয়টি নিয়ে ইতিপূর্বে জেলার সব সংসদ সদস্যগণ সংসদে কথা বলেন এবং জেলা সদরে স্থাপনের দাবি জানান। পরবতীর্তে সংসদে সুনামগঞ্জে দেখার হাওরপাড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান হিসেবে আইনে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এখনো এটি জেলা সদর থেকে দূরে শান্তিগঞ্জ উপজেলায় স্থাপনের তৎপরতা অব্যাহত আছে।
হাওরপার বলে যে বিষয়টি দৃশ্যমান হচ্ছে, সেটি হচ্ছে দেখার হাওর। জলাভূমির জীববৈচিত্র্য ও জলার পরিবেশ সুরক্ষার দাবি এখন বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। জলবায়ূ পরিবর্তন পরিস্থিতি পরিবেশ-প্রতিবেশকে নাজুক করে দিয়েছি। এ অবস্থায় প্রাকৃতিক জলাভূমি রক্ষার চেয়ে বড় দাবি আর কিছু নেই। এই জেলায় অসংখ্য পতিতভূমি রয়েছে। যেগুলো অনাবাদী। সেই সব জমি বা জায়গা চিহ্নিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ঠিকানা হোক।
সরকারের পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে একটি বিশেষ সভায় সুনামগঞ্জের সন্তান, মেহেরপুর ও টাঙ্গাইলের সাবেক জেলা প্রশাসক এবং সরকারের যুগ্মসাচিব ড. আতাউল গণি বলেছেন, বিগত সময়ে সারা দেশের জেলা শহরগুলোর উন্নয়ন হলেও সুনামগঞ্জ শহরের কোনো প্রত্যাশিত পরিবর্তন বা উন্নয়ন হয়নি। শহরের মাত্র পাঁচ শতাংশ পরিবর্তন হয়েছে। তা ও ঋণাত্মক পরিবর্তন। শহরের কোনো অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি, নাগরিক সুবিধাও বৃদ্ধি পায়নি, নেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা। বেড়েছে কর্মহীন গরিব মানুষের সংখ্যা, করুণ শিক্ষাদীক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা। অর্থাৎ জেলা শহরটি প্রায় মৃত হয়ে পড়ছে।
ওই সভায় সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা ডা. বিধান রঞ্জন রায়সহ উপস্থিতি সকলেই এই কথায় সমর্থন জানান।
সুনামগঞ্জ জেলা শহরের কাছাকাছি সুবিধাজনক স্থানে বিশ্ববিদ্যালয় হলে পুরো জেলারই আর্থিক, সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক একটি বিদ্যুৎসাহী সমাজ গড়ে উঠবে। সুবিধা ভোগ করবেন জেলা সদরসহ বিশ্বম্ভরপুর, ধর্মপাশা, তাহিরপুর, জামালগঞ্জ, দোয়ারাবাজার, ছাতক, জগন্নাথপুর, শান্তিগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা, মধ্যনগর উপজেলার বাসিন্দাগণ।
সবশেষে আরেকটি বিষয় আমরা আমাদের দেখার অভিজ্ঞতা থেকে গ্রহণ করতে পারি। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক হচ্ছে আমাদের একমাত্র যোগাযোগের পথ। এই পথের সিলেট প্রান্তে মহাসড়কমুখী শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত। একই সড়কে সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অবকাঠামো ঝুঁকিপূর্ণ।
শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার এক যুগ পর মহাসড়ক সচল রাখতে সুরমা নদীর ওপর আরেকটি সেতু করে বিকল্প যোগাযোগ করা হয়েছে। তবু শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকেন্দ্রিক যে কোনো তৎপরতায় কুমারগাঁও থেকে সিলেট নগরীর প্রবেশ মুখ পুরোটা অবরুদ্ধ থাকার আশঙ্কা থাকে। আমাদের এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণে সেই ভাবনাও ভাবতে হবে। একই সড়ক পথ নিষ্কণ্টক রাখতে নিরাপদ দূরত্বে হওয়া চাই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
আগামিকাল ২২ জানুয়ারি বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় আমাদের প্রথম নাগরিক মতবিনিময় সভা। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে এই সভায় উপস্থিত হয়ে সবাইকে সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
আমাদের দাবিকে জনদাবিতে রূপ দিতে এই সভায় আমরা সবার কথা শুনব, সবার মতামতকে একটি মতের ওপর দাঁড় করিয়ে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নির্ধারণ করব।
সত্য ও সুন্দরের পক্ষে অবিচল