পরিবেশ ও প্রকৃতির ভালবাসায় আজ সুন্দরবন দিবস

- আপডেট সময় : ০৯:৩১:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০২৫ ১৬৪ বার পড়া হয়েছে
সুন্দরবন, প্রশস্ত বনভূমি যা বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম। সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখণ্ড বনভূমি।আজ সুন্দরবন দিবস, ভালবাসুন সুন্দরবনকে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি সুন্দরবন দিবস পালিত হয়ে আসছে।
২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আওতায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশের উদ্যোগে এবং দেশের আরও ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠনের অংশগ্রহণে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সেই সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয়। সে হিসেবে এবার পালিত হচ্ছে ২৪ তম সুন্দরবন দিবস।
সুন্দরবন রয়েছে ৫ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ৩০ প্রজাতির চিংড়ি মাছ রয়েছে।
সুন্দরবন বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। বিশ্বে বিরল প্রজাতির বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একমাত্র আবাসভূমি এই সুন্দরবনে।
বাংলাদেশের আয়তনের ৪ দশমিক ২ শতাংশ এবং বনাঞ্চলের ৪৪ শতাংশ জুড়ে থাকা এ বনের প্রাকৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম।
মূল্যবান প্রাণিজ, জলজ ও বনজসম্পদ মিলে অফুরন্ত প্রাকৃতিক সম্পদের আধার। এই সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের উৎস নয়, একই সঙ্গে বনসংলগ্ন লাখ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার উৎস হিসেবে অবদান রাখছে। দেশের অন্তত ৪০ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল।
জীববৈচিত্র্যের প্রাচুর্যের জন্য ১৯৯২ সালে সুন্দরবনকে রামসার সাইট হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
আর ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেসকো সুন্দরবনকে প্রাকৃতিক বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সুন্দরবনের আয়তন ১০ হাজার ২৮০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে বাংলাদেশে ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের বৃহত্তম বাদাবনের এই স্বীকৃতি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই গর্বের।
বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে সুন্দরবন গড়ে উঠেছে অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং জীববৈচিত্র্য নিয়ে। বৈজ্ঞানিক, নৃ-তাত্ত্বিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিবেচনায় সুন্দরবন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
জীববৈচিত্র্যের আধার ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য ১৯৯৭ সালে তিনটি অভয়ারণ্য এলাকাকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে ইউনেসকো। তিনটি বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য নিয়ে গঠিত ওই বিশ্ব ঐতিহ্য এলাকার আয়তন ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ হেক্টর।
সুন্দরবন ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইডের পাশাপাশি বিশ্বের বৃহৎ জলাভূমি। সুন্দরবনের জলভাগের পরিমাণ ১ হাজার ৮৭৪ দশমিক ১ বর্গকিলোমিটার, যা সমগ্র সুন্দরবনের ৩১ দশমিক ১৫ ভাগ।
এ ছাড়া সুন্দরবনের সমুদ্র এলাকার পরিমাণ ১ হাজার ৬০৩ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার। এই জলভাগে ছোট-বড় ৪৫০টি নদী ও খালে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ইরাবতিসহ ছয় প্রজাতির ডলফিন, ২১০ প্রজাতির সাদা মাছ, ২৪ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির কাঁকড়া, ৪৩ প্রজাতির মলাস্কা ও এক প্রজাতির লবস্টার।
সুন্দরবনের আয়তনের ৬৮ দশমিক ৮৫ ভাগ অর্থাৎ ৪ হাজার ২৪২ দশমিক ৬ বর্গকিলোমিটার হচ্ছে স্থলভাগ। সংরক্ষিত এই বনের তিনটি এলাকাকে ১৯৯৭ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের ইউনেসকো ৭৯৮তম ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইড ঘোষণা করে, যা সমগ্র সুন্দরবনের ৩০ ভাগ এলাকা।
সুন্দরী, গেওয়া, গরান, পশুরসহ ৩৩৪ প্রজাতির উদ্ভিদরাজি রয়েছে। এ ছাড়া ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর মধ্যে রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও হরিণসহ ৪২ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, লোনাপানির কুমির, গুইসাপ, কচ্ছপ, ডলফিন, অজগর, কিংকোবরাসহ ৩৫ প্রজাতির সরীসৃপ ও ৩১৫ প্রজাতির পাখি রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন ও নানা প্রতিকূল পরিবেশ, নেতিবাচক পরিস্থিতির কারণে শুধু বাঘ নয়, বনের সামগ্রিক জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। সাগরে পানির মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ত পানি পান করে বাঘ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে। ইতিধ্যেই সুন্দরবন থেকে হারিয়ে গেছে এক প্রজাতির বন্যমহিষ, দুই প্রজাতির হরিণ, দুই প্রজাতির গণ্ডার, এক প্রজাতির মিঠাপানির কুমির।
সুন্দরবন ও এর জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ ও উন্নয়নে বিগত সরকার ২৯৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ৬টি প্রকল্প কাজ হতে নিলেও সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি।
প্রতিনিয়ত বনখেকোদের আগ্রাসনের ফলে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন আজ হুমকির মুখে। সুন্দরবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ গোটা দেশের পরিবেশ।
পলিথিন এবং প্লাস্টিক দূষণ হতে সুন্দরবনের জলজসম্পদ বিশেষ করে জীব, প্রাণী ও উদ্ভিদ বৈচিত্রকে সুরক্ষায় ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টিসহ সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলে সুন্দরবনের সুরক্ষায় সচেতনতা প্রয়োজন।
সুন্দরবনের প্রতিবেশ, বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা, বিজ্ঞানভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা ও উপকূলীয় এলাকায় সবুজ বেষ্টনী তৈরি প্রয়োজন।
তথ্য সুত্র : ইন্টারনেট।