সুনামগঞ্জ ০২:৫১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

বুয়েটের শিক্ষক যখন কুলাঙ্গার হয়!!!

অধ্যাপক মোঃ মনিরুজ্জামান
  • আপডেট সময় : ০১:৪০:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ মার্চ ২০২৫ ৭৩ বার পড়া হয়েছে
সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

২০১৮ সালের ঘটনা; তখন আমি বুয়েটের বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের প্রধান। আল আরাফাত হোসেন নামে আমার এক ছাত্র একদিন আমাকে ফোন দিল। সে বলল, ছাত্রলীগ তাকে খুঁজছে। আমি যেন তাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করি।

 

বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব ছাড়াও আমি ছিলাম আরাফাতের ছাত্র উপদেষ্টা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘তুমি কোথায়’। সে আমাকে জানাল ইসিই ভবনের ১৪ তলার একটি কক্ষে লুকিয়ে আছে। আমি ফোন দেই ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদারকে। সত্য প্রসাদ সেখানে গেলেন এবং আমাকে জানালেন ছাত্রলীগের ছেলেদের তিনি বুঝিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন। কোনো সমস্যা নেই। আমি যেন আরাফাতকে নিয়ে যাই।

 

আমি আরাফাতকে আনার জন্য আমার বিভাগের শিক্ষক হুমায়ুন আহমেদকে পাঠাই। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে আমাকে ফোনে জানালেন ছাত্রলীগের লোকজন তার কাছ থেকে আরাফাতকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি বললাম, তুমি মার খেলেও আরাফাতকে তাদের হাতে দেবে না।

 

অনেক ঘটনার পর একটি রিকশায় করে তিনি আরাফাতকে আনলেন। রিকশায় তাদের পেছনে পেছনে মোটরসাইকেলে করে আসল ছাত্রলীগের ১২-১৩ জন। ততক্ষণে আমার বিভাগের আরো কয়েকজন শিক্ষক সেখানে হাজির হলেন। ছাত্রলীগের ছেলেরা আরাফাতকে শিবির আখ্যা দিয়ে তাদের কাছে তুলে দেওয়ার দাবি জানাল। আমি তাদের দাবি মানতে অস্বীকার করলে তারা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বলল, ‘আপনারা রাজাকার ছেলেদের পড়ান। আপনারা স্বাধীনতাবিরোধী।’

 

এরপর তারা এক পর্যায়ে আরাফাতকে আমাদের কাছ থেকে জোর করে চুল ধরে মারতে মারতে নিয়ে গেল। আরাফাত তখন হাউমাউ করে কাঁদছিল। ছাত্রলীগের ছেলেরা আরাফাতকে জিমনেসিয়ামের পেছনে নিয়ে নির্মমভাবে পেটাল। তাকে পেটানোর দৃশ্য দেখতে ছিল এরকম এক ছাত্র আমাকে সেখান থেকে ফোন করে জানাল নির্যাতনের কথা। আমি তখন আমার বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমিনুল ইসলামকে নিয়ে ছুটে গেলাম উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের কাছে। আমি তাকে সব ঘটনা বলার পর তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই।’

 

আমি তার এ কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হলাম, প্রতিবাদও করলাম। এক পর্যায়ে আমি বললাম, আপনি কিছু না করেন অন্তত রেজিস্ট্রারকে বলেন। তখন তিনি বাধ্য হয়ে তার পিএস কামরুলকে বললেন রেজিস্ট্রারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে এবং পদক্ষেপ নিতে। এ সময় আমার কাছে খবর আসতে থাকে ছাত্রলীগের ছেলেরা আরাফাতকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে চলছে।

 

আমি তখন অওয়ামী লীগ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন শিক্ষক, ছাত্রলীগের যারা মারছে তাদের কয়েকজনের সরাসরি শিক্ষকদেরও ফোন দিলাম। কিন্তু কেউ কোনো সাড়া দিল না। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদারকে জানালাম আরাফাতকে ছাত্রলীগের ছেলেরা ক্যাম্পাসে পেটাচ্ছে, তাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন। তিনি তখন আমাকে বললেন, ‘আমি মিটিংয়ে আছি।’ তার এ কথা শুনে আমি আবারো হতবাক হলাম। আমি তাকে বললাম আপনি না বলেছিলেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা চলে গেছে। আরাফাত নিরাপদ। কিন্তু তিনি আমার কথার কোনো জবাব দিলেন না এবং আরাফাতকে উদ্ধারেরও কোনো ব্যবস্থা নিলেন না।

 

পরে আমি রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাগলাম। তার উদ্যোগে এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে আসলেন লালবাগ থানার ওসি, উপ-ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মোস্তফা এবং চিফ সিকিউরিটি অফিসার। তারা গুরুতর আহত অবস্থায় আরাফাতকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

 

সেদিন যদি আরাফাতকে উদ্ধার করা না যেত তাহলে হয়তো ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হতো। আরাফাত সেদিন মারা গেলে সেটা হতো একটি টার্নিং পয়েন্ট এবং আবরার হয়তো মারা যেত না। আবরার মারা যাওয়ায় সেটা টার্নিং পয়েন্টে রূপ নেয় এবং জাতি জানতে পারে বুয়েটের অন্ধকার অধ্যায়ের কথা।

-সাবেক বিভাগীয় প্রধান
বস্তু ও ধাতব কৌশল, বুয়েট

অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের সাক্ষাৎকার ১৬ মার্চ, ২০২৫ এ আমার দেশ পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে নেওয়া

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

বুয়েটের শিক্ষক যখন কুলাঙ্গার হয়!!!

আপডেট সময় : ০১:৪০:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ মার্চ ২০২৫

২০১৮ সালের ঘটনা; তখন আমি বুয়েটের বস্তু ও ধাতব কৌশল বিভাগের প্রধান। আল আরাফাত হোসেন নামে আমার এক ছাত্র একদিন আমাকে ফোন দিল। সে বলল, ছাত্রলীগ তাকে খুঁজছে। আমি যেন তাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করি।

 

বিভাগীয় প্রধানের দায়িত্ব ছাড়াও আমি ছিলাম আরাফাতের ছাত্র উপদেষ্টা। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম ‘তুমি কোথায়’। সে আমাকে জানাল ইসিই ভবনের ১৪ তলার একটি কক্ষে লুকিয়ে আছে। আমি ফোন দেই ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক ড. সত্য প্রসাদ মজুমদারকে। সত্য প্রসাদ সেখানে গেলেন এবং আমাকে জানালেন ছাত্রলীগের ছেলেদের তিনি বুঝিয়ে সরিয়ে দিয়েছেন। কোনো সমস্যা নেই। আমি যেন আরাফাতকে নিয়ে যাই।

 

আমি আরাফাতকে আনার জন্য আমার বিভাগের শিক্ষক হুমায়ুন আহমেদকে পাঠাই। কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে আমাকে ফোনে জানালেন ছাত্রলীগের লোকজন তার কাছ থেকে আরাফাতকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। আমি বললাম, তুমি মার খেলেও আরাফাতকে তাদের হাতে দেবে না।

 

অনেক ঘটনার পর একটি রিকশায় করে তিনি আরাফাতকে আনলেন। রিকশায় তাদের পেছনে পেছনে মোটরসাইকেলে করে আসল ছাত্রলীগের ১২-১৩ জন। ততক্ষণে আমার বিভাগের আরো কয়েকজন শিক্ষক সেখানে হাজির হলেন। ছাত্রলীগের ছেলেরা আরাফাতকে শিবির আখ্যা দিয়ে তাদের কাছে তুলে দেওয়ার দাবি জানাল। আমি তাদের দাবি মানতে অস্বীকার করলে তারা আমাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বলল, ‘আপনারা রাজাকার ছেলেদের পড়ান। আপনারা স্বাধীনতাবিরোধী।’

 

এরপর তারা এক পর্যায়ে আরাফাতকে আমাদের কাছ থেকে জোর করে চুল ধরে মারতে মারতে নিয়ে গেল। আরাফাত তখন হাউমাউ করে কাঁদছিল। ছাত্রলীগের ছেলেরা আরাফাতকে জিমনেসিয়ামের পেছনে নিয়ে নির্মমভাবে পেটাল। তাকে পেটানোর দৃশ্য দেখতে ছিল এরকম এক ছাত্র আমাকে সেখান থেকে ফোন করে জানাল নির্যাতনের কথা। আমি তখন আমার বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক আমিনুল ইসলামকে নিয়ে ছুটে গেলাম উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলামের কাছে। আমি তাকে সব ঘটনা বলার পর তিনি বললেন, ‘এ ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই।’

 

আমি তার এ কথা শুনে বিস্ময়ে হতবাক হলাম, প্রতিবাদও করলাম। এক পর্যায়ে আমি বললাম, আপনি কিছু না করেন অন্তত রেজিস্ট্রারকে বলেন। তখন তিনি বাধ্য হয়ে তার পিএস কামরুলকে বললেন রেজিস্ট্রারের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলতে এবং পদক্ষেপ নিতে। এ সময় আমার কাছে খবর আসতে থাকে ছাত্রলীগের ছেলেরা আরাফাতকে নির্মমভাবে অত্যাচার করে চলছে।

 

আমি তখন অওয়ামী লীগ হিসেবে পরিচিত কয়েকজন শিক্ষক, ছাত্রলীগের যারা মারছে তাদের কয়েকজনের সরাসরি শিক্ষকদেরও ফোন দিলাম। কিন্তু কেউ কোনো সাড়া দিল না। ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদারকে জানালাম আরাফাতকে ছাত্রলীগের ছেলেরা ক্যাম্পাসে পেটাচ্ছে, তাকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করুন। তিনি তখন আমাকে বললেন, ‘আমি মিটিংয়ে আছি।’ তার এ কথা শুনে আমি আবারো হতবাক হলাম। আমি তাকে বললাম আপনি না বলেছিলেন, ছাত্রলীগের ছেলেরা চলে গেছে। আরাফাত নিরাপদ। কিন্তু তিনি আমার কথার কোনো জবাব দিলেন না এবং আরাফাতকে উদ্ধারেরও কোনো ব্যবস্থা নিলেন না।

 

পরে আমি রেজিস্ট্রারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে লাগলাম। তার উদ্যোগে এক পর্যায়ে ঘটনাস্থলে আসলেন লালবাগ থানার ওসি, উপ-ছাত্রকল্যাণ পরিচালক অধ্যাপক মোস্তফা এবং চিফ সিকিউরিটি অফিসার। তারা গুরুতর আহত অবস্থায় আরাফাতকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন।

 

সেদিন যদি আরাফাতকে উদ্ধার করা না যেত তাহলে হয়তো ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হতো। আরাফাত সেদিন মারা গেলে সেটা হতো একটি টার্নিং পয়েন্ট এবং আবরার হয়তো মারা যেত না। আবরার মারা যাওয়ায় সেটা টার্নিং পয়েন্টে রূপ নেয় এবং জাতি জানতে পারে বুয়েটের অন্ধকার অধ্যায়ের কথা।

-সাবেক বিভাগীয় প্রধান
বস্তু ও ধাতব কৌশল, বুয়েট

অধ্যাপক মনিরুজ্জামানের সাক্ষাৎকার ১৬ মার্চ, ২০২৫ এ আমার দেশ পত্রিকার প্রতিবেদন থেকে নেওয়া