পানির প্রবাহের স্থান নিয়েছে বিস্তীর্ণ বালুচর
ফারাক্কার প্রভাবে আরো বিপন্ন দশা পদ্মার

- আপডেট সময় : ১০:৪৭:৫৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ ২০২৫ ৫০ বার পড়া হয়েছে
ভারতের ফারাক্কা ব্যারেজের মাধ্যমে পানি আটকানোর প্রতিক্রিয়ায় আরো বিপন্ন দশায় পড়েছে বাংলাদেশের পদ্মা নদী। শুষ্ক মওসুমের শুরুতেই পানির প্রবাহের স্থান নিয়েছে বিস্তীর্ণ বালুচর। এর ফলে নদীকেন্দ্রিক প্রকৃতি, পরিবেশ ও জীবনযাত্রা সংকটপূর্ণ হয়ে পড়ছে।
চলতি বছরের শুষ্ক মওসুম শুরু হতে না হতেই ফারাক্কার প্রবল প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক নদী গঙ্গার বাংলাদেশ অংশের পদ্মায়। উজান থেকে পানির প্রবাহে জোর কমে গিয়ে নদী আরো শীর্ণ থেকে শীর্ণতর হয়ে পড়ছে পদ্মার মূল ধারা। দুপাড়ের চরের বিস্তারের মাঝে কিছু কিছু রেখা চোখে পড়ে মাত্র। আসন্ন ভরা খরার মওসুম আসার পর কী দশা দাঁড়াবে পদ্মার, সে নিয়ে চিন্তিত কৃষক, জেলে, মাঝিসহ এই নদীর উপর নির্ভরশীল লাখ লাখ মানুষ।
খবর নিয়ে জানা গেছে, পদ্মায় পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনক কমে যাওয়ায় সেচের পানিরও সংকট দেখা দিয়েছে। পদ্মায় স্রোত না থাকায় প্রতি বছর লাখ লাখ টন পলি এসে জমছে পদ্মার বুকে। উজান থেকে পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি না আসায় নদী ক্রমশ বালুর নিচে চাপা পড়ছে। বাড়ছে বালুচরের বিস্তৃতি আর ঘনত্ব। এখন ঢেউয়ের পরিবর্তে শোভা পায় চিক চিকে বালুচর। মাইলের পর মাইল শুধু বালু আর বালু। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে প্রকৃতিতে। হারিয়ে গেছে অর্ধশতাধিক প্রজাতির মাছ। জীবিকা হারাচ্ছে মৎস্যজীবী ও জেলেরা।
ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী পানি না পাওয়া অব্যাহত থাকায় এই পরিস্থিতি হচ্ছে বলে জানা গেছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গার উৎস থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত বহু বাঁধ আর কৃত্রিম খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করে চলেছে ভারত। শুধু ফারাক্কা বাঁধ নয়, কানপুরের গঙ্গা ব্যারাজ ও হরিদুয়ারে গঙ্গার পানি প্রত্যাহারে নির্মিত কৃত্রিম খালসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করেছে তারা। এছাড়া উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় চারশত পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এসব পয়েন্ট থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। এর ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ গঙ্গার পানির ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেআরসিতে ব্যর্থতা
সম্প্রতি ভারতের কলকাতায় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন-জেআরসি’র বৈঠক হলেও সেখানে প্রত্যাশিত কোনো ফল পাওয়া যায়নি। কলকাতা বর্তমান পত্রিকার খবর মতে, জেআরসি’র সদস্যদের আলোচনা সভায় গঙ্গা-পদ্মার পানি বণ্টনের বিষয়টি উঠেইনি। ২০২৬ সালে শেষ হচ্ছে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গঙ্গা-পদ্মা পানিবণ্টন চুক্তি। তার আগে পাঁচদিনের রাজ্য সফরে এসে ফারাক্কা পরিদর্শনে গিয়েছিলেন যৌথ নদী কমিশনের সদস্যরা। তাতে উপস্থিত ছিলেন দুই দেশেরই নদী বিশেষজ্ঞরা। তারপর কলকাতার একটি পাঁচতারকা হোটেলে সেচদপ্তরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব মণীশ জৈনের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। স্বাভাবিকভাবেই বহু প্রতীক্ষিত গঙ্গা-পদ্মা পানি বণ্টন নিয়ে রাজ্যের মতামত জানতে চাওয়া হবে বলেই প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু সূত্রের খবর, এনিয়ে কোনো আলোচনাই হয়নি। স্থান পায়নি তিস্তা চুক্তি প্রসঙ্গও। ফলে অনিশ্চিত হয়ে গেলো আগামীতে বাংলাদেশের পানি প্রাপ্তির বিষয়টিও।
বিপন্ন জলাধারগুলো
পদ্মায় পানি না আসায় কেবল পদ্মা নয়Ñ এই বিশাল পানির ভা-ারকে কেন্দ্র করে এতোদিন টিকে থাকা জলাধারগুলোও বিপন্ন অবস্থায় পড়েছে। একসময় পদ্মার উপচে পড়া পানিতে আশেপাশে খালবিলও ভরে উঠতো। কিন্তু উজান থেকে পদ্মায় পর্যাপ্ত পানি না আসায় নদী ক্রমশ বালির নীচে চাপা পড়েছে। গত ৫০ বছরে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে বালুচরের উচ্চতা বেড়েছে ১৮ ফুটেরও বেশি। বর্ষা মওসুমে মাস তিনেকের জন্য নদীতে পানি থাকলেও বছরের নয় মাসজুড়েই তলানিতে থাকছে পানি। শীর্ণ খালের রূপ নিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক সময়ের প্রমত্তা পদ্মা। পদ্মা মরে যাবার সাথে সাথে শাখা-প্রশাখা নদ-নদী বড়াল, মরা বড়াল, মুছাখান, ইছামতি, ধলাই, হুড়া সাগর, চিকনাই, গড়াই, মাথাভাঙ্গা, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রা, বেতা কালিকুমার, হরিহর, কালিগঙ্গা, কাজল, হিসনা, সাগরখালি, চন্দনা, কপোতাক্ষ, বেলাবতসহ পঁচিশটি নদ-নদীর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন। স্থানীয়রা বলছেন, ভারত উজানে বাঁধ দেয়ার ফলে পদ্মা ছাড়া এর শাখা উপশাখাগুলোও অস্তিত্ব হারানোর পথে। ভারতের পানি আগ্রাসী নীতি শুধু এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলোকেই শুকিয়ে মারেনি। এর প্রভাব পড়েছে এসব নদীর সাথে সংযুক্ত খাল বিলেও। এ অঞ্চলের বিখ্যাত বিল চলনবিল, এক সময় যার বিস্তৃত পানিরাশি দেখে বোঝার উপায় ছিল না এটা বিল না নদী। বিল হালতি, বিল হিলনা, মহানগর, বিলভাতিয়া, উথরাইল, খিবির বিল, চাতরা, মান্দার বিল, বিলকুমলী, পাতি খোলা, অঙ্গরা, চাঙ্গা, দিকমী, পারুল, সতী, মালসী, ছোনী, বাঘনদী, পিয়ারুল, মিরাট, রক্তদহ, কুমারীদহ, খুকসী, জবায়ের বিল, বাঁধ বাড়িয়া গ্রামের বিল আর দহ হারিয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি থেকে।
ফারাক্কার মুখে পানি চাই
এবিষয়ে বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও রাজশাহী চ্যাপ্টারের সভাপতি, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, ভারত বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের উপর যে আগ্রাসন চালিয়ে আসছে পানি আগ্রাসন তার মধ্যে অন্যতম। উজানের প্রতিটি বাংলাদেশমুখি নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করে চলেছে। বিশেষ করে গঙ্গার উপর বাঁধ, ক্যানেল ও প্রকল্প তৈরি করে পানি আটকে রাখায় ফারাক্কায় পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি জমা হতে পারছে না। একারণে বাংলাদেশ কখনোই যথেষ্ট পরিমাণ পানি পায় না। এর মূল সমাধান হলো ভারতকে তার আগ্রাসী নীতি পরিহার করতে হবে এবং ফারাক্কার মুখে যাতে শুষ্ক মওসুমে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি জমা হতে পারে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি এব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারেরও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানান।
তথ্যসূত্র: দৈনিক সংগ্রাম