বোনের পছন্দের জিলাপি

- আপডেট সময় : ০১:১২:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৭ মার্চ ২০২৫ ৫৭ বার পড়া হয়েছে
চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়া যুবক
ভাই মাফ চাই, ছাইড়া দেন ভাই, ভাই দুইটা পায়ে ধরি ভাই, আর মাইরেন না, ভাই আমি রোজা রাখছি, আর আমুনা ভাই।
রোজার কথা শুনে থেমে গেল দু’জন।
বাড়ি কই তোর?
কলাবাগান বস্তিতে।
তুই মসজিদ হতে চুরি করস?
তোর কলিজা কত বড়?
পাশের লোকটা বলল ভাই থামলেন কেন? দেন আর কয়ডা, রোজার মাসে চুরি কইরা বেড়ায়,,সালারে
লাত্থি দেন,,তুই চুরি করস আবার কিসের রোজা রাখস রে?মিছা কথার জায়গা পাস
না? এই বলেই কান বরাবর সজোরে আরেক টা থাপ্পড় বসিয়ে দিল।ছেলেটা গালে হাত দিয়ে দেয়াল ঘেসে বসে রইল,, কান্না আর হই হুল্লোড়ের শব্দে ইমাম সাহেব দোতলা থেকে নেমে এলেন, দেখলেন মসজিদের আঙিনায় লোক
জড়ো হয়ে আছে।মসজিদে আজ ইফতারির ব্যাপক আয়োজন চলছিল। ইমাম সাহেব এগিয়ে গিয়ে বললেন,,কি
হইছে এখানে?
হুজুর চোর ধরছি!ছেঁচড়া চোর!
ইমাম সাহেব এগিয়ে গিয়ে দেখলেন ১২-১৩ বছরের এক ছেলে দেয়াল ঘেসে বসে আছে,ছেলেটির পুরো গাল চোখের পানিতে ভেসে গেছে, গায়ের রঙ কালো হলেও আঘাতের দাগ গুলো স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।ইমাম সামনে আসাতে ছেলেটি আরও ভয় পেয়ে গেল। এবার আর তার রেহাই নাই, হাত পা কাঁপছে।
কি চুরি করছে? দেখি?পাশে লোকটি পলিথিনের পোটলা এগিয়ে দিয়ে দিয়ে বলল দেখেন হুজুর,,দেখেন !
ইফতারের আয়োজন হচ্ছে, এই ফাঁকে শালায় পলিথিনে ভইরা লইছে। এক্কেরে
হাতে নাতে ধরছি!হুজুর পলিথিন হাতে নিয়ে দেখলেন আধা কেজির মত জিলাপি, ৬ টা আপেল, আর কিছু খেজুর ভিতরে ছিল।
হুজুর বললেন,,তাই বইলা এভাবে গণ পিটুনি দিছো কেন? এইটা কেমন বিচার?
বাচ্চারে কেউ এভাবে মারে নাকি? এবার লোক জনের উত্তেজনা একটু থেমে গেল।
হুজুর ছেলেটিকে জিজ্ঞাস করেন,তর বাপ কি করে? ছেলেটা কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেল। বলল,,,, সাইকেল ঠিক করত, বাপের অসুখ তাই অহন কাম করে না।
হুজুর আমারে ছাইড়া দেন।
আমি আগে কোন দিন চুরি করি নাই।কয়েকটা বাসায় হাত পাইতা একটা দানাও সাহায্য পাই নাই।পরে দেহি মসজিদে খাবার।বাড়িতে নিবার জন্যে তুইলা নিছি।ভুল হইয়া গেছে আমারে মাফ কইরা দেন। পাশ থেকে লোক গুলো বলছে, এগুলা সব মিথ্যা কথা, ধরা খাইয়া এখন ভদ্র সাজে। হুজুর
বললেন, ইফতার শেষ হোক,সত্য মিথ্যা দেখে ওর বাপের কাছে জানিয়ে সতর্ক করে দেয়া হবে। ছেলেটাকে কেউ পানি দেও, ও অনেক হাঁপাচ্ছে।একজন পানির বোতল এগিয়ে দেয়।
ছেলেটি উত্তর দেয়,, আমি রোজা!
ইমাম সাহেব এবার লোকগুলোর দিকে একটু বিরক্ত মুখে তাকালেন।ছেলেটিকে অজু করিয়ে তার পাশে বসিয়ে ইফতার
করালেন। ইফতার আর নামাজ শেষে সেই দুই জন লোক ও ছেলেটিকে নিয়ে ইমাম সাহেব বস্তির দিকে এগুলেন। এক চালা টিনের ঘর, বাইরে দুয়ারে ছেলেটির বাবা বসে আছে।সব কিছু শুনে বাবাটি তার ছেলের গালে থাপ্পড় মারার জন্যে হাত উঠায়। হুজুর বাধা দিয়ে বলেন, যথেষ্ট মার হইছে, ওরে আর মাইরেন না।বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলে,, বিশ্বাস করেন হুজুর, আমার ছেলেরে আমি এই শিক্ষা দেই নাই। বেশ কয়দিন ধইরা আমার অসুখ। কাম কাজ নাই,পোলা পানগো ঠিক মত খাওন যোগাইতে পারি না।কিন্তু পোলায় চুরি করব,, কোনদিন ভাবি নাই। ও অমন পোলা না।
এরই মধ্যে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ছেলে টির বোন। মেয়েটার বয়স ছয় বছরের
মত। বোনটি তার ভাইয়ের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়,কোমল স্বরে বলে, ভাই,
জিলাপি আনো নাই? তুমি না আইজকা জিলাপি আনবা কইছো? ভাইয়ের মুখে কোন কথা নেই, চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যেই আরেকটি চার বছরের ছোট্ট বোন ঘর থেকে ছুটে এসে বলে, ‘ভাই,
ওরে না, ওরে না আমারে আগে দিবা, আমারে।’
এই বলেই হাতটি বাড়িয়ে দেয়,,,,ভাইয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,,ভাই
তুমি একলা একলাই খাইয়া আইছো? আমার জন্যে আনো নাইই? ভাইটি এবার ছোট বোনের কথা শুনে কেঁদে ফেলে।বোন দুইটা মন খারাপ করে ঘরে ঢুকে যায়।ছোট বোনটা মায়ের কোলে উঠে কান্না জুড়ে দেয়। মা আচলে মুখ ঢেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন।বলেন,, মাইয়া দুইটা কয় দিন ধইরা জিলাপি খাইতে চাইতেছে,,,,, ওগো বাপের অসুখ ।টেকা পয়সাও নাই, তাই পোলারে বাইরে পাঠাই ছিলাম বাড়ি বাড়ি গিয়া কিছু সাহায্য চাইয়া আনতে। ছোট মানুষ বুঝে নাই,তাই ভুল করে ফেলছে।খাবার সামনে পাইয়া নিয়া নিছে, অরে আফনেরা মাফ কইরা দিয়েন। এদিকে বাচ্চা মেয়েটা চোখ ভিজিয়ে মায়ের কাছে কেঁদে কেঁদে নালিশ করেই
যাচ্ছে- মা, ভাই আইজকাও জিলাপি আনে নাই, ভাই আমাগো খালি মিছা কথা কয়! ভাইটি মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ বোনটি খেয়াল করে ভাইয়ের শার্টের পকেট ভেজা!
<> ভাই তোমার পকেটে কি?
এই বলেই হাত ঢুকিয়ে দেয়,বের করে দেখে দুইটা জিলাপি! ভাই তুমি আনছো?
দুই বোনের মুখে হাসি ফুটে উঠে!
ভাইয়ের মুখ এবার ভয়ে চুপসে যায়। লোক দুটির দিকে ভয়ার্ত ভাবে তাকিয়ে
বলে, স্যার, এইটা আমি চুরি করি নাই। হজুরের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকে,
বিশ্বাস করেন হজুর,এইটা আমার ভাগের জিলাপি, ইফতারির সময় আমার ভাগেরটা উঠাইয়া রাখছিলাম বোইন দুইটার জন্যে, সত্যি আমি চুরি করি নাই হজুর।
সবাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হজুর ছেলে টারে টেনে বুকে জড়িয়ে নেন। মাথাটা বুকে চেপে ধরে রেখে চোখের পানি ফেলতে থাকেন। লোক দুইজন
এবার সশব্দে কেঁদে ওঠেন।কাঁদতে কাঁদতে ছেলেটির বাবার কাছে এগিয়ে যায়।তার হাত দুটি ধরে বলে, ভুল হয়ে গেছে আমাদের, আপনার ছেলের গায়ে হাত তুলছি আমরা, মাফ করে দিয়েন আমাদের। লোকটি পকেট থেকে মানি ব্যাগটা বের করে বাবার হাতে দিয়ে বললেন, এখানে যা আছে তা দিয়ে
বাচ্চাদের কিছু খাওয়াবেন।তারা লজ্জায় আর বেশিক্ষণ থাকতে পারলো না, বিদায় নেয় দ্রুত। আমরা শুধু অপরাধীকে দেখি কিন্তু অপরাধের পেছনের অংশটুকু দেখি না,দেখতে চাইও না।
কিছু কথা আমরা পছন্দের জামা
কিনতে গেলে এক দুইশ টাকা বেশি গেলেও কিছু যায় আসে না,কিন্তু ফকিরকে পাঁচ টাকার বেশি দিতে গেলে আত্মায় গিয়ে লাগে।আমরা কি পারি না
ইফতারির কিছু খাবার ওদের দিতে? আমরা কি পারি না সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা ওদের দান করতে?
আমরা কি এতটাই ফকির?
আসলে ফকির আমরা না, ফকির ওরাও না,
ফকির হচ্ছে আমাদের মন-মানসিকতা!
ফকির হচ্ছে আমাদের বিবেক।