ড. শামসুল আলম গোলাপ : মেঘের আড়ালে এক প্রদীপ্ত সুর্য
- আপডেট সময় : ০৭:২৬:৩১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ৫ মে ২০২৫
- / 905
সবারই কি পিএইচডি দরকার আছে ? কারো কারো ব্যক্তিত্ব ও কর্মের গভীরতা এমন যে তাদের ওপরইতো পিএইচডি হবে। যেমন, আমেরিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন-এর কথাই বলি, নিজের ঝুলিতে পিএইচডি নাই কিন্ত তাতে কী ? তার ওপর বই লেখা হয়েছে ১৬ হাজার; ধারনা করি পিএইচডি হয়েছে ৫শএর মতো ; ৬৪টি থিসিসের শিরোনামের এর তালিকাতো আমার কাছেই জব্দ আছে।
অবশ্য আলবার্ট আইনস্টাইন নিজেও পিএইচডি করেছেন এবং তার ওপর পিএইচডি হয়েছেও বেশুমার ।
২০১৬ থেকে ২০ এ পাঁচ বছর ঝড়োপাখির মতো গিয়ে মালয়েশিয়ার বিশ্বসেরা এক ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসে আশ্রয় নিয়েছিলাম। সেখানে প্রায় শতাধিক দেশের হাজারো নবীন- প্রবীন শিক্ষক-গবেষক-নেতা-কর্মীদের সাথে মেশার সুযোগ হয়েছে । কিন্তু এর মাঝে দু-চারজন ছিলেন সুর্যের মতোই দেদীপ্যমান ।
একজনের কথা না বললেই নয় ; নামও তার – জগতের সুর্য, আবার গোলাপের সুরভিও তাতে লাগানো। এতক্ষণে নিশ্চয়ই ধরে ফেলেছেন, তিনি শাসসুল আলম গোলাপ। বয়সে অনেক নবীন হওয়ার পরও আমি তাকে নেতা মানি।
তোমাদের ভেতর সর্বোত্তম ব্যক্তি কে ? এর উত্তরে বিশ্ব-সেরা মানুষ মুহাম্মদ সা. এর ১৬টি হাদিস আমার সংগ্রহে আছে । এর অনেকগুলোই গোলাপ ভাইয়ের জীবনের সাথে মিলে যায়; বিশেষ করে দুটি-
এক) হযরত আবু হুরাইরা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, একদা রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে উপবিষ্ট অবস্থায় বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তিটি কে, আমি কি তা তোমাদের বলব?’ সাহাবায়ে কেরাম নিশ্চুপ রইলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথা তিনবার বললেন। অতঃপর জনৈক সাহাবি আরজ করলেন, ‘অবশ্যই বলুন, হে আল্লাহর রাসুল।’ রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো যার থেকে সবাই মঙ্গলের আশা করে এবং তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকে।’ (তিরমিজি, হা. : ২২৬৩)
দুই) হযরত আয়েশা (রা.) সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজের পরিবারের কাছে ভালো।’ (তিরমিজি, হা. : ৩৮৯৫)।
পরিচিতজন মাত্রেই সাক্ষ্য দিবেন এ হাদিসদুটির
জ্বলন্ত উদাহরণ গোলাপ ভাই নিজে।
আমরা দেখি, অনেকেই পদ-পদবী-ক্ষমতা-স্বার্থ এগুলোর পিছনে দৌড়ায় আর হয়তো পেয়েও যায়। কিন্তু নিজের অজান্তেই অনুগামীদের ভালোবাসার আসন থেকে ছিটকে পড়ে।
এর বিপরীতে গোলাপ ভাই অসীম যোগ্যতা থাকার পরেও ক্ষমতা-পদ-স্বার্থ এসব থেকেই একটু দূরে-দূরেই থাকেন, আনুগত্যের পারাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন । তাই জনশক্তির প্রাণঢালা ভালোবাসায় সর্বদা আপ্লুত হন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-এর জনসংখ্যা ও আবাসন শুমারি ২০২২-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশে ৫১,৭০৪ পিএইচডি ডিগ্রিধারী ছিলো । এরপর আরো ২ বছর গত হয়েছে, প্রবাসে স্থায়ীভাবে আছেন এমন অনেকে বাদ পড়তে পারেন, তাই সংখ্যাটা অবলীলায় ৬০ হাজার ধরা যায়। তাহলে ১৮ কোটি মানুষের ভেতর প্রতি ৩ হাজারে একজন পিএইচডি ডিগ্রীধারী। যদিও আমেরিকায় প্রতি ৫০জনে ১ জন ।
তাই আমাদের একজন পিএইচডি ডিগ্রীধারী তার পেছনের প্রায় ৩ হাজার মানুষকে জ্ঞানের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দেবেন এটাই কাম্য। কিন্তু অধিকাংশক্ষেত্রে হয় উল্টোটা- তিনি জ্ঞানচর্চা এমনকি সামাজিক মেলামেশায় হয়ে পড়েন সীমাবদ্ধ , কেউ ভুলে লিখতে বা বলতে গিয়ে তার নামের আগে ড. যুক্ত করলো কীনা এ নিয়েই সদা পেরেশান থাকেন।
অভ্যুত্থানের এ সংঘাতময় সময়ের আগে-পরে কিছু ব্যতিক্রমী মানুষ যেমন. মামুন ভাই, যোবায়ের ভাই তুরস্ক থেকে , মোজাম্মেল ভাই ইউকে থেকে, মনোয়ার ভাই ঢাবি এবং আতিক মুজাহিদ , গোলাপ ভাই মালয়েশিয়া থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। তাই আমরা সঠিকভাবে তাদের অর্ভ্যথনা দিতে পারিনি।
আমাদের প্রত্যাশা তাদের জ্ঞান-গবেষণা বাংলাদেশ-উম্মাহকে এক নতুন দিগন্তে পৌঁছে দিবে।
বিশ্বের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ততম পিএইচডি থিসিস হচ্ছে আমেরিকার একজন গণিতবিদ ডেভিড রেক্টর-এর ; ১৯৬৬ সালে সম্পন্ন থিসিসটি ছিলো মাত্র ৯ পৃষ্ঠা; ১১৯ লাইন-এর।
আর গত শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের “A New Determination of Molecular Dimensions” শিরোনামে ১৯০৬ সালে সম্পন্ন পিএইচডি থিসিস ছিল মাত্র ১৮ পৃষ্ঠার । এ থিসিসটি বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ধৃত গবেষণা-কর্ম।
তাই বিস্তৃত গবেষণার চাইতে গভীর গবেষণা এবং মানবতার কল্যাণে সে কাজে আমৃত্যু যুক্ত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ ।
কিছু মানুষ পিএইচডি করলে সে ডিগ্রীটাই বরং ধন্য ও আলোকিত হয় । গোলাপ ভাইয়ের পিএইচডি ঠিক তেমনি এক ঘটনা।
২০১০-এ যিনি ফ্যাসিস্ট-সরকার দ্বারা অনেক দিন গায়েব ছিলেন। দেশে তার জীবন ছিলো শঙ্কাময় । ১৪ বছর পর আজ তিনি মেঘমুক্ত এক প্রদীপ্ত সুর্য। আল্লাহপাক তাকে ও তার পরিবারকে দ্বীনের জন্য কবুল করুন।
( গত সেপ্টেম্বর,২৪-এ তার পিএইচডির শেষপর্বে লেখা)














